তথাকথিত ‘৬৩ বুড়ি’-কে নিয়ে তৈরি হয়েছে মাশ-আপ ভিডিও। তাতে গানের ফাঁকে বসেছে মহিলার মুখ থেকে উচ্চারিত গালাগালি।
'63 Buri'
ইউটিউব কতটা এগিয়ে দিচ্ছে মানব সভ্যতাকে? এই বিষয়ে মাধ্যমিক বা উচ্চ মাধ্যমিকের বাংলা-য় যদি রচনা লিখতে বলা হয়, তা হলে আশ্চর্য হবেন না। দিনকাল পুরো ইউটিউবেরই। সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টানোর জন্য এই খনি অনন্ত। তার উপরে বেবাক স্বাধীনতা যা খুশি আপলোড করার। বোথ ওয়ে ট্রাফিক। হিঁয়াসে গাড়ি ঘুসাও হুঁয়াসে নিকাল দো। এই আসা-যাওয়ার পথের ধারেই যা খেলার, তা খেলে নাও। ইউটিউবে নিয়মিত ভ্রমণরতরা জানেন, এই খেলা এক অন্তহীন পরিসরে। কূল নাই কিনার নাই অথই দরিয়ার পানি। সেই দরিয়ায় যেমন সোনার পাহাড়ওয়ালা দ্বীপ রয়েছে, অমরত্বের আরক-সমৃদ্ধ কলস রয়েছে, তেমনই অজানা হিংস্র প্রাণী-টানিও রয়েছে।
অনেকেই বলে থাকেন, ইউটিউব একসময়ে টিভি-কে আউট করে দেবে। দিক। তাই যেন হয় মা মঙ্গলচণ্ডী। কদর্য সিরিয়াল, খবরের নামে অতিনাটক, গান শোনানোর নামে জগঝম্প, সাক্ষাৎকারের নামে কতগুলো অনড্বানের আত্মপ্রচার আর হাসিমুখে দন্তশূল ঢেকে বাংলা উচ্চারণরতা কিছু অ্যাঙ্কর দেখে দেখে চোখে মরু সাহারা। এর বাইরে কি বেরতে পারে না অডিও-ভিস্যুয়াল? নেট-সভ্যতা বাংলা বাজারে জাঁকিয়ে বসতেই ইউটিউবের রমরমা। বাঙালির সমোসকিতি জমে ক্ষীর। স্ক্রল আর ক্লিক। রবিঠাকুর থেকে ডিজে বাপন— এক্কেবারে হরিহরছত্র। কিন্তু এই আনন্দের হাটে কীভাবে ঘাপলা ওৎ পাতচে, তা খেয়াল রাখছেন কি?
গত কয়েক মাস যাবৎ ইউটিউব থেকে সোশ্যাল মিডিয়ায় উপচে ওঠা ভিডিওগুলির মধ্যে একটায় চোখ আটকে গেল। এক বৃদ্ধা কোনও গ্রামের রাস্তা দিয়ে হাঁটছেন, আর কেউ তাঁর ভিডিও তুলছে। সেই ভিডিও-কর্তা মাঝে মাঝে বলে উঠছে— ‘তেষট্টি’। আর এতেই সেই মহিলা ক্ষেপে উঠছেন। শাপ-শাপান্ত, বাপ-বাপান্ত করছেন। ভিডিওকারী কিন্তু নির্লিপ্ত গলায় বলেই যাচ্ছে— ‘তেষট্টি’। এর অনুষঙ্গে যে ভিডিওগুলি ইউটিউবে অটো-সাজেস্টেড হল, তার চরিত্রও একই প্রকার। প্রায় প্রতিটিতেই কোনও না কোনও বৃদ্ধ বা বৃদ্ধা এই ধরনের ভিডিওবাজির শিকার হচ্ছেন।
তরকারি বিক্রেতা মহিলা। ছবি: ইউটিউব
কোনওটিতে এক বৃদ্ধাকে দেখা যাচ্ছে সামান্য তরি-তরকারি নিয়ে বাজারের এক প্রান্তে বসে থাকতে। তার পরে তাঁকে উত্যক্ত করছে ওইরকমই কোনও ভিডিওবাজ। এই দুই মহিলাকে দেখে কোনও মতেই পাগলিনী বলে মনে হয় না। কিন্তু এমন অনেক মানুষকে উত্যক্ত করার ভিডিও ইউটিউবে রীতিমতো ভাইরাল, যাঁদের মানসিক সুস্থতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। আর একটা ব্যাপার, এই সব ভিডিওর বেশির ভাগই বাংলা। অন্য প্রদেশের ভিডিও তেমন নেই।
এখানেই শেষ নয়। তথাকথিত ‘৬৩ বুড়ি’-কে নিয়ে তৈরি হয়েছে মাশ-আপ ভিডিও। তাতে গানের ফাঁকে বসেছে মহিলার মুখ থেকে উচ্চারিত গালাগালি। তাঁকে ঢিনচ্যাক পূজার সঙ্গে মিলিয়েও নির্মিত হয়েছে ভিডিও।
প্রশ্ন এই, কোন মানবিকতা এই জাতীয় বেলেল্লাপনাকে পারমিট করে? কোন মানবিকতায় লোকে এই কুৎসিত কাজ ইউটিউবের মতো এক গণমাধ্যমে আপলোড করে? কোন মানসিকতার লোকেরা এগুলিকে ফেসবুকে ক্যারি করে? কোন মানসিকতা থেকে এই ধরনের ভিডিওর সংখ্যা ক্রমবর্ধমান?
এঁদের নিয়ে তৈরি হয়েছে মাশ-আপ ভিডিও-ও, ছবি: ইউটিউব
বাংলার সংস্কৃতিতে বৃদ্ধ-বৃদ্ধার পিছনে লাগা কোনও নতুন ব্যপার নয়। ১৯৮০-র দশকে উত্তম দাস নামে জনৈক হাস্যকৌতুক শিল্পী ‘দাদুর লাল টমেটো’ নামে এক কমিক বাজারে ছেড়েছিলেন। সেই কমিকের উপজীব্য ছিল এক বৃদ্ধকে নিছেক ক্ষেপানো। তাঁকে ‘লাল টমেটো’ বললে তিনি রেগে যান। আর সেটাই ইনিয়ে বিনিয়ে লোকে বলে যায়, তিনি গালাগাল করেন। এই নিয়ে যে কেউ হাসতে পারে বা একে যে কেউ হাস্যরস সৃষ্টির উপাদান বলে ভাবতে পারে, সেটা ভাবাই দুষ্কর। কিন্তু উত্তমবাবুর সেই কমিকটি ছিল তুমুল জনপ্রিয়। এই কমিকের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে হাটে-বাজারে অনেক বৃদ্ধকেই ‘লাল টমেটো’ বলে আওয়াজটি শুনতে হয়েছে।
এখন জিজ্ঞাস্য, এই ধরনের প্রমোদে কোন নন্দন উৎপাদিত হয়? কারা নন্দিত হন এথেকে? উত্তম দাসের কমিকের শ্রোতারা ছিলেন আপামর পাবলিক। তাদের ‘অশিক্ষিত’ ট্যাগ দিয়ে সরিয়ে রাখা যায়। কিন্তু ইউটিউব ধামসানো লোকদের কি সেই ট্যাগ লাগানো সম্ভব? হাতে হাই রেজলিউশন ভিডিও উৎপাদনকারী মোবাইল যাঁর, তাঁকে আর যাই হোক ‘পিছড়ে বর্গ’ বলাটা সমীচিন হবে না। তিনি নিজেকে ‘এগিয়ে থাকা’ টেকস্যাভি সমাজের সদস্য ভাবতেই ভালবাসেন। কিন্তু তাঁর এই সামাজিক নৈতিক বোধটাই নেই, এই ধরনের কাজ কার্যত অপরাধ। যে কোনও দেশে তা আইনত দণ্ডনীয়। সাইবার ক্রাইম নিয়ে তৎপর আইনরক্ষকরা কী ভাবেন, তা জানা নেই।
এই দুঃস্থ মহিলাও ইউটিউবারদের ট্রল-এর শিকার। ছবি: ইউটিউব
আইনের কথা থাক। রুচির প্রশ্নটা নিয়েও কি কেউ মাথা ঘামান না! ফেসবুকে এই রাম-এই রহিম, জেন্ডার, সিরিয়ার শিশু ইত্যাদিতে পাবলিকের বিবেক চলকে ওঠে। কিন্তু বাংলার মাটিতে (তা সে যে বাংলাই হোক) এই ভাবে বৃদ্ধ-নির্যাতনের অর্থটা ঠিক কী, সেই প্রশ্ন কি একবারও ফেসবুকে উঠেছে?
আরও একটা ব্যাপার মনে হয়। ফেসবুক বা সোশ্যাল মিডিয়া— আরও বৃহত্তর অর্থে দেখলে ইন্টারনেট ব্যাপারটাই বাংলায় বিশে, বাবে ‘যৌবন-নির্ভর’। স্মার্টফোন, যা এই মুহূর্তে নেটিজেন হওয়ার প্রধানতম চাবিকাঠি, তার ইউজার মূলত ১৭-৪৫ বছরের মধ্যে। সিনিয়র সিটিজেনের হাতে সেই ম্যাজিক ওয়ান্ড নেই। তাই সে এই ভার্চুয়াল ওয়ার্ল্ডে ট্রল হওয়ার সামগ্রী মাত্র। নাকি এই প্রবণতার পিছনে যৌবন নামক এক ধোঁয়াটে ধারণার অহেতুক জয়গান গাওয়ার রাজনীতিই কাজ করে? ব্রিটিশ শাসনে বেড়া ওটা সংস্কৃতি বাঙালিকে শিখিয়েছিল যৌবনই জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়। তার পর থেকে ‘এজ পলিটিক্স’-এ দেশে এক ভয়াবহ আকার ধারণ করে। আজকের জারগনে যাকে ‘এজিস্ট’ বলে, সেই কিসিমেই নির্মিত হয় এই জাতীয় ভিডিও। আপলোড হয়। আপনি-আমি-রামা-শ্যামা দেখি। আর খিল্লি বাড়ে। খিল্লি খিলখিলিয়ে বাড়ে।
টিকটক-ইউসি ব্রাউজার-সহ ৫৯টি চিনা অ্য়াপ নিষিদ্ধ ভারতেটিকটক, শেয়ারইট, ইউসি ব্রাউজার, লাইকি, ইউচ্য়াট, বিগো লাইভ-সহ মোট ৫৯টি চিনা অ্য়াপ নিষিদ্ধ করল তথ্য়-প্রযুক্তি মন্ত্রক।
সীমান্ত উত্তেজনার আবহে চিনের বিরুদ্ধে বড়সড় পদক্ষেপের পথে হাঁটল কেন্দ্র সরকার। টিকটক, শেয়ারইট, ইউসি ব্রাউজারের মতো জনপ্রিয় চিনা অ্য়াপ নিষিদ্ধ করল ভারত সরকার। টিকটক, শেয়ারইট, ইউসি ব্রাউজার, লাইকি, ইউচ্য়াট, বিগো লাইভ-সহ মোট ৫৯টি চিনা অ্য়াপ নিষিদ্ধ করল তথ্য়-প্রযুক্তি মন্ত্রক। টিকটক, শেয়ারইট, ইউসি ব্রাউজার, লাইকি, ইউচ্য়াট, বিগো লাইভ ছাড়াও নিষিদ্ধ অ্য়াপের তালিকায় রয়েছে ক্লাব ফ্য়াক্টরি, এমআই কমিউনিটি, ভাইরাস ক্লিনার, এমআই ভিডিও কল-শাওমি, হেলো, বিউটি প্লাস, ইউ ক্য়াম মেকআপ, ক্য়াম স্ক্য়ানার, সুইট সেলফি, প্য়ারালেল স্পেস, ইউসি নিউজ, উই মিট, ডিইউ রেকর্ডার, মোবাইল লেজেন্ডস, ওন্ডার ক্য়ামেরা। তথ্য় প্রযুক্তি মন্ত্রকের তরফে এ ব্য়াপারে জানানো হয়েছে, ওই অ্য়াপগুলি দেশের সার্বভৌমত্ব, অখণ্ডতা, দেশের সুরক্ষার জন্য় ক্ষতিকারক। সেকারণেই ওই অ্য়াপগুলিকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তথ্য় প্রযুক্তি আইনের ৬৯এ ধারায় অ্য়াপগুলি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তথ্য় প্রযুক্তি মন্ত্রকের তরফে জানানো হয়েছে, ১৩০ কোটি ভারতবাসীর তথ্য় সুরক্ষিত রাখার প্রশ্নে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অ্য়ান্ড্রয়েড ও আইওএস প্ল্য়াটফর্মে মোবাইল অ্য়াপকে অপব্য়...
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন